জ্বালানি দামের ঊর্ধ্বগতি: খাদ্য, পরিবহন ও বাণিজ্যে ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা

প্রকাশ :
সংশোধিত :

জ্বালানির দাম লিটারপ্রতি ১৫–২০ টাকা বাড়ানোর ফলে বৈশ্বিক সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন, বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন টন ডিজেল ব্যবহৃত হয়, যার প্রায় ২৪ শতাংশ কৃষিখাতে ব্যবহৃত হয়। সেচের প্রায় ৮০ শতাংশই এই জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া জমি প্রস্তুত, ফসল কাটা, মাড়াই ও পরিবহনেও ডিজেল অপরিহার্য।
শনিবার সরকার ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা থেকে ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ টাকা থেকে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করেছে।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে অর্থনীতির বিভিন্ন খাত, মূল্যস্ফীতি, বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যবস্থায় চেইন-প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে বলে উদ্বেগ জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ, কৃষি বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা। কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, এতে কৃষকদের বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বার্ক) সাবেক নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. ওয়াইস কবির বলেন, উৎপাদন খরচ বাড়ায় কৃষকদের ন্যায্য দাম পাওয়া কঠিন হবে, একই সঙ্গে বাজারে খাদ্যের দাম বাড়বে, যা নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াবে।
তিনি জানান, বর্তমানে বোরো ধান কাটার মৌসুম হওয়ায় সেচের চাপ কম থাকলেও ফসল কাটা, মাড়াই ও পরিবহন ব্যয় বাড়বে। এতে কৃষকের খরচ বাড়ার পাশাপাশি চালের দামও বাড়তে পারে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. রশিদুল হাসান বলেন, ভারত থেকে আমদানি বাড়ায় ধানের দাম আগে থেকেই কম, ফলে কৃষকরা লাভ নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন। নতুন করে জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে, যা পুরোপুরি সেচনির্ভর। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৯ লাখ কৃষিযন্ত্র রয়েছে, যার ৭৫ শতাংশই ডিজেলচালিত। এ অবস্থায় কৃষকদের সহায়তায় ডিজেলের সরবরাহ নিশ্চিত ও ভর্তুকি দেওয়ার ওপর জোর দেন বিশেষজ্ঞরা।
টিকে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে পণ্যমূল্যে পুরোপুরি প্রতিফলিত না হলেও পরিবহন ব্যয় ও কাঁচামালের দাম বাড়ায় অনেক পণ্যের দাম ইতোমধ্যে সমন্বয় করা হয়েছে।
এদিকে জ্বালানি সংকটের কারণে পণ্য পরিবহনে ট্রাক ও পিকআপ ভাড়াও ইতোমধ্যে ১৫–২০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। গত দুই সপ্তাহে সবজি, ভোজ্যতেল, মাছ ও মুরগির দামও বাড়তির দিকে রয়েছে।
পরিবহন খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের ভাড়া নির্ধারণ কমিটি বাসভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে বৈঠক করলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রতি কিলোমিটারে ০.২২ টাকা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব আলোচনা হয়েছে।
যদিও প্রথম দিন বাসে আগের ভাড়াই নেওয়া হয়েছে, পরিবহন মালিকরা জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। রাইড শেয়ারিং সেবাগুলোও ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি ভাড়া নিয়েছে।
তবে যাত্রী কল্যাণ সমিতি ভাড়া বাড়ানোর আগে যাত্রীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। নৌপরিবহন খাতেও লঞ্চ ভাড়া ৩৬–৪২ শতাংশ বাড়ানোর দাবি উঠেছে। বর্তমানে দূরপাল্লার বাসভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ দশমিক ১২ টাকা এবং শহরে ২ দশমিক ৪২ টাকা।
পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিতভাবে জ্বালানির দাম সমন্বয় করা উচিত—শুধু বাড়ানো নয়, কমলে কমাতেও হবে।
তিনি সতর্ক করেন, জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়বে, যা ইতোমধ্যে বাড়তির দিকে রয়েছে। একই সঙ্গে কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
শিল্প উদ্যোক্তারা জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে জেনারেটর চালাতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজেল প্রয়োজন হচ্ছে, ফলে মাসিক ব্যয় কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, জ্বালানির দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। তবে ভর্তুকি দিলে সরকারের রাজস্বে চাপ পড়বে—এটি একটি দ্বৈত সংকট।
সিপিডির ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তবে বাজারে যাতে অযৌক্তিকভাবে ভাড়া ও পণ্যমূল্য না বাড়ে, সে জন্য কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তিনি নিম্ন ও স্থির আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদারের পরামর্শ দেন।
জ্বালানি উপদেষ্টা ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে জ্বালানি আমদানি করতে হওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে দাম সমন্বয় ছাড়া সরকারের আর কোনো বিকল্প ছিল না।


For all latest news, follow The Financial Express Google News channel.